আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): আয়াতুল্লাহ লাঙ্কারানি মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজ ও বিশেষ করে আল আযহারের আলেম সমাজকে উদ্দেশ করে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত বিস্ময়কর ও অপ্রত্যাশিত বিবৃতি দেখেছি।
ইসলামী শিক্ষার ঐতিহ্য ও স্বাধীন নীতির জন্য বিখ্যাত এমন একটি প্রতিষ্ঠান আজ এমন এক বিবৃতি দিয়েছে যা সত্যিই মেনে নেয়া যায় না।
আমরা ফিলিস্তিন ও গাজার বিষয়ে আল আযহারের সঠিক ও যথাযথ অবস্থানগুলো ভুলব না, কিন্তু আজকের এই বিবৃতি আলেম সমাজের মনে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
আল আযহার কি নিজেকে এই প্রশ্ন করছে না যে কেনো এ অঞ্চলের কথিত মুসলিম সরকারগুলো তাদের আকাশ ও ভূমিকে কাফের ও ইহুদিদের কাছে ছেড়ে দিয়েছে? এই বিশ্ববিদ্যালয় কি নিজেকে প্রশ্ন করছে না যে এই অঞ্চলে উপস্থিত থেকে ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে কোন্ লক্ষ্যগুলো হাসিল করতে চায় আমেরিকা ও ইসরাইল? আপনারা কি এটা ভেবে দেখছেন না এরা মুসলমানদের সম্পদের উৎসগুলো বা খনিগুলো কিভাবে লুট করার এবং তাদের জান ও মাল ধ্বংসের চেষ্টা করছে?
ইহুদি ও কাফেরদের কর্তৃত্ব মেনে না নিতে পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে মহান আল্লাহ যে নির্দেশ দিয়েছেন আল-আযহার কি তা ভুলে গেছে?
পবিত্র কুরআনের যে আয়াতে বলা হয়েছে, যে তোমার বিরুদ্ধে আগ্রাসী আচরণ করে তুমিও তার ওপর সে ধরনের আঘাত হান যেরকম আঘাত সে তোমার ওপর হেনেছে (সুরা বাকারা-১৯৪)-এই আয়াতের আলোকে ইসলামী ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে ধরনের নৃশংস আগ্রাসনের শিকার হয়েছে এ অঞ্চলে থাকা তাদের ঘাঁটিগুলোর মাধ্যমে সেই প্রেক্ষাপটে ইরানের কি জবাব দেয়ার অধিকার নেই?
পবিত্র কুরআনের এ আয়াত যেখানে মহান আল্লাহ বলেছেন, 'যখন জালিম বা অত্যাচারীকে শাস্তি দাও তখন সে তোমার সঙ্গে যেরকম অত্যাচার করেছে কেবল সেরকম শাস্তি তাকে দাও' (সুরা নাহল-১২৬)-এই আয়াতের আলোকে ইরানকি সমমাত্রার জবাব দেয়ার অধিকার কি রাখে না?
সুরা হজ্জের (২২:৩৯) এই আয়াত যেখানে মহান আল্লাহ বলেছেন, 'লড়াই করার অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা জুলুমের শিকার হয়েছে তাদের ওপর যুদ্ধ ও হামলা চাপিয়ে দেয়ার কারণে, আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম'- এরই আলোকে ইরান কি জবাব দেয়ার বৈধতা রাখে না?
সুরা মুমতাহিনার প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
یا ایها الذین آمنوا لا تتخذوا عدوی و عدوکم أولیاء تلقون إلیهم بالمودة-
অর্থাৎ হে ইমানদারগণ, আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না-এই পবিত্র আয়াত কি আপনারা পড়েননি কিংবা তা কি ভুলে গেছেন?
«یا ایها الذین آمنوا لا تتولوا قوماً غضب الله علیهم»
অথবা সুরা মুমতাহিনার ১৩ নম্বর আয়াতটির প্রতি কি আপনাদের বিশ্বাস নেই যেখানে বলা হয়েছে হে ইমানদারগণ, তোমারা বন্ধু বানিও না তাদেরকে যাদের ওপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট?
«لا تجد قوماً یؤمنون بالله والیوم الآخر یوادّون من حادّ الله و رسوله»
অথবা সুরা মুজাদিলার ২২ নম্বর আয়াত তথা শেষ আয়াতের এ অংশ যেখানে মহান আল্লাহ বলছেন, তোমরা কখনও এমন দেখতে পাবে না যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভালবাসছে যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরোধিতা করেছে- এই আয়াতকে কি আমরা আমাদের কাজকর্ম ও কথার আদর্শ বা মাণদণ্ড করব না?
আপনাদের এই বিবৃতি কি হাদিসে সাকালাইন নামে পরিচিত বিখ্যাত হাদিসটির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যে হাদিস মুসলিম মাজহাবগুলোর মধ্যে মুতাওয়াতির বা বহু নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হাদিস, নাকি এর সম্পূর্ণ বিপরীত তথা পবিত্র কুরআন ও মহানবীর (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের লক্ষ্যগুলোর পুরোপুরি বিপরীত?
আল আযহার কি মুসলমানদের মধ্যে সর্বসম্মত ফিক্হি তথা আইনি এই ভিত্তিকে ভুলে গেছে- কিংবা মুসলমানদের ফিকাহ বা ইসলামী আইন শাস্ত্রের বইগুলোতে কি এ কথা বলা হয়নি যে কোনো মুসলমান যদি কাফেরদের এমনভাবে সহায়তা করে যে তাতে তারা মুসলমানদের অন্য একটি দলের বা গ্রুপের ওপর সফল হয় তাহলে ওই ব্যক্তিও কাফের হিসেবে সাব্যস্ত হবে এবং সে যদি কাফেরদের জন্য ঢাল হয় তাহলে তাকেও অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।
যদি মহান আল্লাহর রাসুল (সা.) আজ আমাদের এই যুগে উপস্থিত থাকতেন তাহলে তিনি কি আমেরিকা ও ইসরাইল এবং আমাদের এ অঞ্চলের যেসব সরকার মুসলমানদের ভূমিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছে-তাদেরকে সমর্থন করতেন নাকি ইরানের মুসলিম জাতিকে সাহায্যের পক্ষে অবস্থান নিতেন যে জাতি শত্রুদের জুলুম ও আগ্রাসনের শিকার হয়েছে?
পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাতের যুক্তিগুলোকে যদি নাও মানা হয় তবুও বিশ্বের মুক্তিকামী ও স্বাধীনচেতা মানুষকে বলুন তো বিবেকের আলোকে এই অঞ্চলের অপরাধী সরকারগুলোর মাধ্যমে এইসব হামলার শিকার হওয়ার পরও ইরানের কি করা উচিত ছিল?
এই দেশটির মুসলমানদের জীবন, রক্ত ও সীমান্তের প্রতিরক্ষা করা কি উচিত নয়? আপনারা কি দেখেননি যে কিভাবে যুদ্ধের প্রথম দিনে এই শত্রুরা মিনাব শহরে শাজারা তাইয়্যেবা নামক স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৬০ জনেরও বেশি নিষ্পাপ শিশুকে শহীদ করা হয়েছে?
আপনারা পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত ও কোন হাদিস এবং কোন বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির ভিত্তিতে এ অঞ্চলের সরকারগুলোর প্রতি সমর্থনের জন্য জেগে উঠেছেন এবং ইরানের নিন্দা করছেন?
‘আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন এমন কাউকে হত্যা করো না কেবল কোনো ন্যয়সঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া’- সুরা আসরার এই ৩৩ নম্বর আয়াতটিকে কেন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলোকে ও কাফেরদেরকে দায়ী করার জন্য পড়েননি?
কেনো আপনারা আল আযহারের আলেমরা ইরানে মুসলমানদের সর্বোচ্চ নেতার (হযরত আয়াতুল্লাহিল উজম খামেনেয়ী-র.) মজলুম শাহাদাতের পর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি?
অথচ তিনি ছিলেন ইসলাম ও মুসলমানদের গৌরবের আহ্বায়ক এবং তিনি বিশ্বের সব মুসলমানের জন্য সম্মান বয়ে এনেছিলেন। আপনারা কি মনে করছেন না যে এ বিবৃতির ফলে মুসলিম বিশ্বে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস বা নির্ভরযোগ্যতা স্তিমিত ও হীনবল হয়ে পড়বে?
বিশ্বের আলেম সমাজের প্রতি বিশেষ করে আল আযহারের প্রতি আমার পরামর্শ বর্তমান মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি সঠিক ও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করুন এবং ধর্মীয় ও আইনি দায়িত্বের আলোকে পদক্ষেপ নিন।
কাফের দলপতি ও সাম্রাজ্যবাদী নেতাদের এবং এ অঞ্চলে তাদের ক্রীড়নকদের সন্তুষ্ট করতে নয়, যাতে মহান আল্লাহ ও ইসলামের প্রিয় মহানবী (সা.) এবং মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র ও মুসলিম সমাজ ও বিশ্বের মুক্তিকামীদের কাছে মর্যাদার অধিকারী হন এবং কখনও যেন এ আয়াতের দৃষ্টান্ত না হন যে আয়াতে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের কোনো অংশ গোপন করে এবং সামান্য মূল্যে তা বিক্রি করে তারা কেবল আগুনই তাদের উদরের জন্য ভক্ষণ করে এবং পুনরুত্থান দিবসে আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি! (সুরা বাকারা-১৭৪)
ربنا اغفر لنا ذنوبنا و اسرافنا فی امرنا و ثبت اقدامنا و انصرنا علی القوم الکافرین»
"হে আমাদের রব (পরওয়ারদেগার) আমাদের পাপগুলো ও নানা কাজে বাড়াবাড়ি বা ক্রুটিগুলো ক্ষমা কর এবং আমাদের পাগুলোকে সুদৃঢ় ও অবিচল কর এবং কাফেরদের মোকাবেলায় আমাদের সহায়তা করুন।" (সুরা আলে ইমরান-১৪৭)
শেইখ মুহাম্মদ জাওয়াদ লাঙ্কারানির ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্র, কোম, ইরান।
Your Comment